সাহিত�য

  • বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতির একটি সর্বজনীন লোক উৎসব,কবিতায় বাংলা নববর্ষ

    newsbazar24: বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতির একটি সর্বজনীন লোক উৎসব। বিপুল উৎসাহ, উদ্দীপনা আর নানান বর্ণিল আয়োজনে বাংলা সনের প্রথম দিনটি পালিত হয়ে আসছে। মঙ্গলযাত্রা, শুভাযাত্রা, মেলা, হালাখাতা খোলা, পান্তাভাত খাওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হয়। বাংলা সনের প্রবর্তক মুঘল সর্মাট আকবর। ভারতবর্ষে মুঘল সা্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার পর স¤্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা মতে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। ফলে খাজনা আদায়ে অরাজকতা দেখা দেয়। তাই খাজনা আদায়ের সুষ্ঠুতা আনয়নের লক্ষ্যে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। স¤্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌরসন এবং আরবী হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম তৈরী করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহনের সময় ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ সাল থেকে।আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেক চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টিমুখ করাতো এবং এই উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এভাবে পহেলা বৈশাখ একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। এই সামাজিক অনুষ্ঠানটি কালের পরিক্রমায় আমাদের শিল্প, সাহিত্যের নানা শাখায় জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে বাংলা কবিতায় নববর্ষ ও বৈশাখ এসেছে ভিন্ন রূপ ও আঙ্গিকে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পহেলা বৈশাখকে চিত্রিত করেছেন এক নবরূপে। কবির পহেলা বৈশাখের নান্দনিক উচ্চারণ- “এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক পুরাতন স্মৃতি, যা ভুলে যাওয়া গীতি, অশ্রæ বাস্প সুদূরে মিলাক। মুছে যাক গøানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নি¯œানে শুচি হোক ধরা রসের আবেশ রাশি শুষ্ক করে দাও আসি, আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাখ মায়া কুজ্বটি কাজল যাক দূরে যাক।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৈশাখ বন্দনার এই গানটি আজ আমাদের নববর্ষ উদযাপনের সূচনা সংগীতের স্থান করে নিয়েছে। পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে রমনার বটমূলে এই সংগীত টি গেয়েই জাতীয়ভাবে বাংলা নববর্ষ কে বরণ করে নেওয়া হয়।  রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতায় পহেলা বৈশাখকে নানা আঙ্গিকে চিত্রিত হতে দেখি। নজরুলের একটি গানে আছে- “এলো এলোরে বৈশাখী ঝড়, ঐ বৈশাখী ঝড় এলো এলো মহীয়ান সুন্দর। পাংশু মলিন ভীত কাঁপে অম্বর, চরাচর থরথর ঘন বন কুন্তলা বসুমতি সভয়ে করে প্রণতি, পায়ে গিরি-নির্ঝর ঝর ঝর।” নজরুলের গানেও পুরনোকে দূর করে, ভুলে গিয়ে নতুনের আবাহনী সুর উচ্চারিত হয়েছে। তাছাড়া নজরুল বাঙালীর আতœবিকাশের সাথে, আতœ সংগ্রামের সাথে বৈশাখ কে মিশিয়েছেন জাতীয়তাবাদের নবচেতনায়। তাইতো তার কণ্ঠেশুনি- “ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল বোশেখির ঝড় তোরা সব জয়ধ্বনি কর তোরা সব জয়ধ্বনি কর।” তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল দ্রোহ সত্তার বাহক হিসেবে বৈশাখ কে চিত্রিত করেছেন। তিনি বলেন-  “আমি ধূর্জটি, আমি এলাকেশে ঝড় অকাল বৈশাখীর! আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী- সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর। বল বীর- চির উন্নত মমশির।” পুরাতন দুঃখ যাতনা ভুলো নতুন আশার বাণী নিয়ে আসে নববর্ষ। নতুনভাবে স্বপ্ন দেখায়, বাঁচতে শেখায় নববর্ষ। কবি কায়কোবাদ তাঁর ‘নববর্ষ’ কবিতায় একথায় বলেছেন- “ওহে পান্থ! অতীতের সুখ দুঃখ ভুলে যাও তুমি অইযে ব্রহ্মা- জুড়ে সম্মুখে রয়েছে পড়ে তোমার সে কর্মক্ষেত্র-মহারঙ্গা ভূমি।” পল্লীকবি জসীম উদ্দীন বৈশাখের রূপ বৈচিত্র চিত্রিত করেছেন ছন্দের তালে তালে। বৈশাখীর প্রকৃতি ব্যাঙময় হয়ে উঠেছে কবির কবিতায়।  “বোশেখ শেষে বালুচরের বোরো ধানের থান, সোনায় সোনা মেলিয়ে দিয়ে নিয়েছে কেড়ে প্রাণ।” কাল বৈশাখীর তান্ডবকে যথাথ চিত্রিত করেছেন কবি বে-নজীর আহমেদ। বৈশাখের ক্ষিপ্রতায় নেচে উঠে নতুন এক প্রকৃতি।  “আকাশ ধরার বাঁধন ছিঁড়ি প্রলয় নাদে যাওরে ডাকি নটরাজের নাচন দোলায় আয় নেচে আয় কাল বৈশাখী।” আরেক পল্লী দরদী কবি বন্দে আলী মিয়া বৈশাখের ধু ধু প্রান্তরের ছবি এঁকেছেন শব্দের গাথুনি দিয়ে।  “বোশেখ শেষের মাঠে ঘিরে আছে তিন চারখানা গাঁও  এ-পারে ও-পারে ছড়াছড়ি ঢের দেখাশুনা হয় তাও।” চৈত্রের অগ্নিদহনে যখন মানুষ প্রশান্তি খোঁজে নতুনের আগমনের প্রতীক্ষায় ক্ষণ গুনে তখনই নববর্ষের জল ধারায় ¯œাত হয় হৃদয় প্রকৃতি। কবি সুফিয়া কামালের কবিতায় :  “চৈত্রের বিষন্ন রাত্রি তার দিয়ে গেল শেষ উপহার প্রসন্ন নবীন বৈশাখের ঝলোমলো দিন। পুরাতন গত হোক! যবনিকা করি উন্মোচন তুমি এসো হে নবীন! হে বৈশাখ! নববর্ষ! এসো হে নতুন।” আধুনিক নগর জীবনের ক্লান্তি, বেদনা, দহন, পিছুটান কে রুপায়িত হতে দেখি শামসুর রাহমানের কবিতায়।  “বৈশাখ তুমি আমার ক্লান্তি পুড়িয়ে দাও জীর্ন পাতার সব হাহাকার উড়িয়ে দাও থাক যত কিছু বাঁধা থাক দিক শত ওরা পিছু ডাক বৈশাখ তুমি বাঁধার পাথরে গুড়িয়ে দাও বাংলা কবিতায় লোকজ শব্দ যে কবি সুনিপূন ভাবে ব্যবহার করেছেন, যার কবিতায় পাই নাগরিকতা ও গ্রামীন চিত্র কল্পের সমন্বয় তিনি কবি আল মাহমুদ। আধুনিক বাংলা কবিতার মাইল পোস্ট তিনি। তিনি ‘বোশেখ’ কবিতায় বৈশাখী ঝড়ের কাছে প্রশ্ন করেছেন গরীব অসহায় মানুষের প্রতি কেন তার এত রুদ্র রূপ। কেন বড় লোকের অট্রালিকার সাথে তার ক্ষমতা দেখায় না! “ যে বাতাসে বুনো হাঁসের ঝাঁক ভেঙে যায় জেটের পাখা দুমড়ে শেষে আছার মারে নদীর পানি শূন্যে তুলে দেয় ছড়িয়ে নুইয়ে দেয় টেলিগ্রাফের থাম গুলোখে। সেই পবনের কাছে আমার এই মিনতি তিষ্ট হাওয়া, তিষ্ট মহাপ্রতাপশালী, গরীব মাঝির পালের দড়ি ছিড়ে কি লাভ? কি সুখ বলো গুড়িয়ে দিয়ে চাষির ভিটে?”

  • আন্তর্জাতিক সংস্কৃতিক সংস্হা গাঙচিলের উদ্যোগে সংস্কৃতিক সন্ধ্যায় সংবর্ধিত বাংলাদেশে আমন্ত্রিত মালদার চার শিল্পী

    মালদা, ৯ই ফেব্রুয়ারীঃ আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সংস্কৃতিক সংস্হা গাঙচিল আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সংস্কৃতিক পরিষদের মালদা  শাখা  ও মালদা শহরের  ছন্দমের উদ্যোগে  শুক্রবার  রাতে বিশিষ্ট  শিল্পী  আশিস উপাধ্যায়ের  বাড়িতে একটি সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা  হয়। অনুষ্ঠানে  নাচ গান আবৃত্তি সহ দুটি  কবিতার বই প্রকাশিত হয় ।  শিখা সরকারের কবিতা র বই  "প্রয়াস" ও চম্পা দাসগুপ্তর  বই " কবিতাগুচ্ছ"।কবিতার বই দুটি প্রকাশ  করেন  বিশিষ্ট  লেখক ও গবেষক গোপাল  লাহা , কালিগঞ্জের মঞ্চ একুশের  সম্পাদক  দুলাল  ভদ্র ও মালদা  গৌড়িয় সংস্কৃতি পরিষদের সম্পাদক  ধরনীধর মন্ডল  ।  এবছরই  বাংলাদেশে ভাষা দিবস উপলক্ষ্যে  মালদার  চার শিল্পীকে আমন্ত্রণ ও সংবর্ধনা দেওয়া হবে । আন্তর্জাতিক  সংস্কৃতিক সংস্হা    "গাঙচিল আন্তর্জাতিক  সাহিত্য ও সংস্কৃতিক পররিষদের" উদ্যোগে এই বছর  বাংলাদেশে  ফেব্রুয়ারি মাস ব্যাপী  ভাষা মাস পালন করা হবে । ভারত বাংলাদেশ  সহ একাধিক  সংস্কৃতিক জগতের  মানুষ কে  সংবর্ধনা  দেওয়া হয় । মালদা  থেকে  যারা আমন্ত্রিত ও সংবর্ধিত হচ্ছেন  তারা  হলেন  বিশিষ্ট  সঙ্গীত শিল্পী আশিস  উপাধ্যায়  , শিখা  সরকার  , চম্পা কলি  দাসগুপ্ত  ও কমল কর্মকার  ।  অনুষ্ঠানে  গাঙচিল আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের মালদা  শাখার পক্ষ  থেকে  বাংলাদেশে  আমন্ত্রিত  চার শিল্পী কে  সংবর্ধনা দেওয়া  হয় ।

  • গ্রাম চর্চার শ্রেষ্ঠ পত্রিকা ‘আগমনী’র দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত।

    কার্ত্তিক পাল , ২৪ ডিসেম্বরঃ ,- গ্রাম চর্চার শ্রেষ্ঠ পত্রিকা ‘আগমনী’। এবার  দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশ পেল । গত বছর পথ চলা শুরু করলেও পত্রিকাটি গবেষণামূলক  তথ্য সমৃদ্ধ হওয়ার সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে । বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে । সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে খুশির খবর । পত্রিকাটির সম্পাদক গৌড় মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ক্ষিতীশ মাহাতো মহাশয় । উপস্থিত ছিলেন পুরুলিয়া সিধু কানু বিড়শা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ডঃ স্বপন কুমার মন্ডল । ডঃ পুস্পজিৎ রায়,  অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব মহাশয় । এই পত্রিকা প্রকাশ উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। বিষয় ছিল “গ্রাম সংস্কৃতি- নগরায়নের অভিঘাত” উক্ত আলোচনা সভায় বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন পুরুলিয়া সিধু কানু বিড়শা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ডঃ স্বপন কুমার মন্ডল, ডঃ পুস্পজিৎ রায়,লোকসংস্কৃতিবিদ, ডঃ সুস্মিতা সোম, অধ্যাপক গৌড়বঙ্গ মহাবিদ্যালয়   ও অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব,অধ্যাপক সামসীকলেজ ও অধ্যাপক ডঃ ক্ষিতীশ মাহাতো মহাশয়।               

  • শিল্পী স্বাগতা পালের একক আবৃত্তি অনুষ্ঠান আগামীকাল শিশির মঞ্চে:-

    কলকাতা,রাজকুমার দাস:বাংলা ও বাঙালিয়ানা হওয়ার স্রোতে আমরা নিজেদের খুব গর্বিত মনে করি। আর গর্বের জায়গা থেকে শুরু হয় এক আলাদা ভাবে লড়াই।যা নিজস্ব ঘরানা কে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।তেমনি বাচিক শিল্পী স্বাগতা পাল তার একক লড়াই কে এগিয়ে নিয়ে চলেছে,আগামী কাল ২৫শে সেপ্টেম্বর শিশির মঞ্চে "সারথি"আয়োজিত এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সারস্বত সন্ধ্যায় স্বনামধন্য কবি সব্যসাচী দেব,সৈয়দ হাসমত জালান,অনির্বাণ ঘোষ সহ সারথীর অন্যতম প্রধান পার্থ মুখোপাধ্যায়কে সংবর্ধনা প্রদান করে তারপর স্বাগতার একক আবৃত্তি শুরু হবে।শিল্পী তার নিজস্ব বাচন ভঙ্গিমায় সুরেলা কণ্ঠে যে দর্শকদের আকৃষ্ট করে রাখবে তা বলাই চলে,আবহ শান্তনু ব্যানার্জী,পার্থ ঘোষের সুযোগ্য ছাত্রী স্বাগতা এগিয়ে চলুক।এদিন দ্বিতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করবেন শ্রাবনী সেন, কথা ও কবিতার সঙ্গত দেবেন সারথীর পার্থ মুখার্জী,অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় থাকছেন মধুমিতা বসু ও দেবাশীষ পাল, স্বাগতার ইতিমধ্যেই চারটি আবৃত্তির এলবাম প্রকাশিত হয়েছে।বাচিক শিল্পী হিসেবে তিনি নিয়মিত ডাক পান সরকারী অনুষ্ঠানে।কখনও সঞ্চালনায় আবার কখনও বা আবৃত্তিতে।স্বাগতার চলার পথ সুগমতর ভাবে এগিয়ে চলুক,এই কামনা করি।

  • কর্মজীবন থেকে সমাজের আয়নায় । অশোক কুমার "সার্চ আউট ট্রুথ ইন দ্য লাইট অফ নলেজ"

    একজন লেখক ই  পারেন সমাজের প্রতিচ্ছবি তার লেখনীর মধ্যে দিয়ে সমাজের ঘটেযাওয়া মুহূর্ত গুলিকে তার শব্দজালে প্রস্ফুটিত করতে। আর এমন এ একটি লেখা হচ্ছে "সার্চ আউট ট্রুথ ইন দ্য লাইট অফ নলেজ"। বইটিতে রয়েছে অতিবাহিত সমাজ এবং যেই সামাজের বাধা বিপত্তিকে পেরিয়ে সহজ সরলভাবে জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। সমাজে সকলেই ভিন্নধরনের বাধা বিপত্তির মাঝে পড়েন ভেঙেও পড়েন কিন্তু সেই বিপত্তিকে পেরিয়ে যাওয়ার পরের কৃতিত্বে সবকিছুকে ভুলে ও বসেন।  লোখক এই বিপত্তিকে এবং তার কৃতিত্বকে তার লেখনীর মধ্যে তুলে ধরেছেন লেখক শ্রী অশোক কুমার। লেখক শ্রী অশোক কুমার হালদার তিনি রেলওয়ে কর্মরত মেল এক্সপ্রেস গার্ড। অশোক কুমার হালদারের বাড়ি মালদা শহরের বিধান পল্লীতে। তার লেখা চারখানা নোবেল প্রকাশিত হয়েছে। যথাক্রমে বইগুলির নাম (১) “সার্চ আউট ট্রুথ ইন দ্য লাইট অফ নলেজ” এই বইটি বিজ্ঞান ও দর্শন উপর ভিত্তি করে লেখা ।(২) “রিমুভ দ্য ডার্ক টু এওএক উপ দ্য লাইট অফ নলেজ” এই বইটি বিজ্ঞান ও দর্শন উপর ভিত্তি করে লেখা।(৩) “দ্য রেডিক্যাল চেঞ্জ অব হিউমেন সোসাইটি অ্যান্ড উইথ ইটস সায়েনটিফিক অবজারভেশন” এই বইটি বিজ্ঞান ও দর্শন উপর ভিত্তি করে লেখা।(৪) “দ্য ড্রাইভারশিফাই লাইফ জার্নি অফ হিউমেন বিনস” তার লেখা বই প্রকাশিত হয়ে গেল ১৩ ই সেপ্টম্বর ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অফ মিডিয়া অ্যান্ড ইন্টারটেন্মেড ইনডাশাট্রি এন্ড এশিয়ান অ্যাকাডেমি অর্ফ আর্ট প্রেজেন্টেড চতুর্থ  গ্লোবাল লিটারএসি ফেস্ট্রিবেল নওডার অনুষ্ঠান মিঞ্চে  অশোক কুমার হালদারের তার লেখা নোবেল  “দ্য ড্রাইভারশিফাই লাইফ জার্নি অফ হিউমেন বিনস” ইনোগ্রেসেন করলেন অনারবেল মিনিষ্টিার রামদাস আটওয়ালে মিনিস্ট্রি অফ সোসাল জাসটিস অ্যান্ড এমপাউয়ারমেন্ট মিনিষ্টিার গর্ভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া, নিউদিল্লী।

  • ভোট ব্যাঙ্ক আর বাম পকেট•••• __জীবনদীপ বৈঠা(জেপি)

    ভোট ব্যাঙ্ক আর বাম পকেট•••• ___জীবনদীপ বৈঠা(জেপি) রক্তাক্ত পঞ্চায়েতি ডায়েরি, দেশ বাড়িতে অবাধ মৃত্যুর সন্ধন লক্ষ্য- ব্যালট বক্স ক্ষমতা আসুক বছর পাঁচেক ক্যাশ বাক্সের অস্তিত্ব বিছানা তলায়। ফুল কুড়ি'রা আনন্দ মাখে পোষ্টার ছিঁড়ে, লুটিয়ে পড়ছে শৈশব আর বার্ধক্য, নল বোম শান্ত মনে দ্বায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। বয়স্কা চোখের একটা অভিজ্ঞতায়- আমরা আছি ভালো রোজ-ই সারি স্নান চোখ সাগরে আইরিশ পয়েন্টে। কেননা বাম পকেটেই- ভোট ব্যাঙ্কের ওঠানামা

  • রবি ঠাকুরের প্রতি- সুমন বিশ্বাস

    রবি ঠাকুরের প্রতি -সুমন বিশ্বাস সহজ পাঠে তোমার সাথে প্রথম পরিচয় বয়স তখন কত হবে, পাঁচ কিংবা ছয়। তার পর ফি-বছরে তোমার সাথে দেখা, সব ক্লাসের পাঠ্যবই-এ থাকতো তোমার লেখা। কবিতা, ছড়া, নাটক কিংবা রম্যরচনা, কিছুতেই পাইনি খুঁজে তোমার তুলনা। পরশমণির ছোঁয়া পেয়ে মোদের ভাষা শিক্ষা, তোমার সুরেই বঙ্গবাসীর সুর সাধনার দীক্ষা। তোমার বাণী, তোমার লেখা, তোমার গানের সুরে অমর হয়ে থাকবে তুমি মোদের হৃদয় জুড়ে। রাখির বাঁধনে ভুলিয়েছিলে ধর্মের ভেদাভেদ, রাখিবন্ধন আজও চলেছে, পড়েনিকো তাতে ছেদ। দেশপ্রেমের মরা গাঙে আনলে জোয়ার তুমি, তোমার কলমে স্বাধীন হলো মোদের ভারতভূমি। বাংলা ভাষাকে জগৎসভায় শ্রেষ্ট আসন দিলে, বিশ্বলোকে চেতনার রং তুমিই ছড়িয়েছিলে। আপন মনের মাধুরী মিশায়ে এঁকেছিলে তুমি ছবি, দেশ ও কালের সীমানা পেরিয়ে তুমিই বিশ্বকবি। তোমার রচনা চির শাশ্বত চির আধুনিক তুমি, সার্ধশত বছর পরেও তাইতো তোমায় নমি। শত-শত বছর পরেও রবে তুমি অমলিন, তোমার চিন্তা তোমার চেতনা রয়ে যাবে চিরদিন। কিন্তু কবি বং-এর যুগে বাংলা ভুলেছি মোরা, তোমার গানে সুর চড়িয়েছে স্বর বদলেছে ওরা। নব প্রজন্ম টেগোর পড়ে ইংরাজি অনুবাদে, তোমাকেও শেষে পড়তে হল প্রাশ্চাত্যের ফাঁদে। পাইনা ভেবে তোমায় নিয়ে কেন এত কাটা-ছেঁড়া, স্বাধীনভাবে রচনা করতে কিছুই পারেনা এরা! নিন্দুকেরা যে যাই বলুক, যতই তোমায় কাটুক ছিঁড়ুক, জানি তুমি থাকবে অমলিন। চির শাশ্বত তোমার রচনা, তোমার চিন্তা, তোমার চেতনা, রবির কিরণে রয়ে যাবে চিরদিন।

  • মুসাফির - by Aparna

    মুসাফির অপর্না চক্রবর্তী ,মালদা                         আমি হলাম ক্লান্ত পথিক জীবন যুদ্ধে আমি বার বার হেরে গেছি। তবুও এই ছিন্ন মন নিয়ে  হেঁটে চলেছি এক অজানা পথের সন্ধানে।  জানিনা তার শেষ কোথায়! আমি সচক্ষে দেখেছি  জীবন দিয়ে অনুভব করেছি- - এই জীবন নামক অঙ্কটা কি দুর্বিসহ,কি কঠিন। বাস্তবতার কছে বারে বারে হেরে যাচ্ছি। আমি সীমাবদ্ধ আমার সেই ছোট্ট আমিটাতেই।  তবুও এই শূন্য মনটা বারে বারে স্বপ্ন সাজাই।  এই স্বপ্নই সবকিছু শেষ করে দিল। গ্রাস করে ফেলল   আমার ছোট্ট আমিটাকে। আর আমায় করল  ঘর ছাড়া মুসাফির।                                        

  • আমার স্কুল   -  সুমন বিশ্বাস

        আমার স্কুল   -  সুমন বিশ্বাস   তেল মেখে স্নান করে গরম ভাত খাওয়া, বইয়ের ব্যাগ নিয়ে রোজ ইস্কুলে যাওয়া।   ফাস্ট বেঞ্চে বসার জন্য স্কুলে যেতাম আগে,   পেছন সীটে বসতে কি আর কারো ভাল লাগে? নালিশের খাতা ছিল মনিটারের কাছে,   ভয় ছিল সে খাতায় নাম উঠে যায় পাছে।   সেই জন্য মনিটারকে দিত সবাই তেল,   মনিটারেরও ভয় ছিল যদি করে সে ফেল?   পরীক্ষাতে সে বসত আমাদের মাঝখানে।   আমরা যে কি জিনিস ছিলাম মনিটারই তা জানে।   স্কুলের প্রেয়ার ছিল জন-গণ-মন   মানে না জেনেই গেয়েছিলাম, বুঝিনি তখনো। দূরে কোথাও স্কুলে যখন প্রেয়ারের ঘণ্টা পড়ে,   ছোট্ট বেলার স্কুল বাড়িটা বড্ড মনে পড়ে।   ক্লাস রুমের দেওয়াল জুড়ে উপপাদ্য লেখা,   দেওয়াল লিখন পড়েই আমার জ্যামিতি শেখা।   দেওয়াল জুড়ে নিউটন আর সিন্ধু সভ্যতা,   আর ছিল ইঁচড়ে পাকা কিছু অসভ্যতা।   স্কুলে সেই দেওয়াল আজও একই রকম আছে,   আমরাই নেই শুধু সেই দেওয়ালের কাছে।   আজও কোনও স্কুল বাড়ির দেওয়াল লিখন পড়ে,   ছোট্ট বেলার স্কুল বাড়িটা বড্ড মনে পড়ে। প্রতি বছর স্কুলে হত বানী বন্দনা সেই দিনের স্মৃতিটাও ছিল মন্দ না।   স্কুল ড্রেস ছেড়ে সেদিন রঙিন পোশাক পড়া,   স্কুল বাড়িটা হাসি-খুশিতে ছিল সেদিন ভরা।   পুজোর শেষে পাল্লা দিয়ে চলত খিচুড়ি খাওয়া,   এমন করেই লেগেছিল প্রানে খুশির হাওয়া।   আজও, সরস্বতী পুজো যখন হয় আমাদের ঘরে,   ছোট্ট বেলার স্কুল বাড়িটা বড্ড মনে পড়ে। পরীক্ষার আগে ছিল রিভিশনের ধুম,   টেনশনে চোখ থেকে উড়ে যেত ঘুম।   পরীক্ষার সময় তাই সব কিছু ভুলে,   সারা দিন পড়াশোনা বই খাতা খুলে।   কেউ কেউ টুকলিতে ছিল হাত পাকা, পকেট ভর্তি জ্ঞান, মাথা ছিল ফাঁকা।   সিঁড়ি আর বাথরুমে টুকলিরা পেত ঠায়।   সেদিনের স্মৃতি গুলো কি ভাবে ভোলা যায়?   আজও কোনও স্কুলে গিয়ে টুকলি যখন চোখে পড়ে, ছোট্ট বেলার স্কুল বাড়ি তোমায় বড্ড মনে পড়ে। এক মাইল পায়ে হেঁটে যেতে হত ইস্কুলে,   সাইকেল ছিলনা যখন পড়ে ছিলাম মুশকিলে।   ক্লাস এইট পাশ করে সাইকেল ছড়েছি,   তারপর এই সাইকেল-ই সাথী ছিল, যত দিন পড়েছি।   আজও, একই আছে সে স্কুল, আর একই আছে পথের ধুলো   একই আছে সেই উচ্ছ্বাস, শুধু বদলে গেছে সে মুখ গুলো।   আজ, সে পথ দিয়ে যায় যখন, সেই স্কুল চোখে পড়ে,   ছোট্ট বেলার স্কুল বাড়িটা তোমায় বড্ড মনে পড়ে।

  • অগ্নিসাক্ষী  -পূজা মৈত্র ( রানাঘাট )

       অগ্নিসাক্ষী  -পূজা মৈত্র ( রানাঘাট )   মেয়ের কাছাকাছি থাকবেন বলে বিদেশবাবুর এখানে আসা,এখানে বলতে মদনপুরে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন কল্যানীতে। শ্বশুর,শাশুড়ি,জামাই আর মেয়ে-এই নিয়ে সংসার। বছর দেড়েক হল নাতনি হয়েছে। সে এই সংসারে ছোট্ট সদস্য। অত দূরে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার ইছা ছিল না। নিজে থাকতেন ত্রিপুরায়। ফরেস্ট রেঞ্জার ছিলেন। বদলির চাকরি,সেই সুবাদে ত্রিপুরায় সব বন জঙ্গল ঘাঁটা।রিটায়ারকরেছেন মাস চারেক। তারপর একা মানুষের আর ত্রিপুরায় থাকার মানে হয় না। মেয়ের কাছাকাছি থাকলে মন চাইলে ওকে যখন তখন দেখতে অন্তত পাবেন। বিদেসবাবুর মেয়ে অন্তরা এতে খুব একটা খুশি হয়নি,তবুও মুখের উপর না করতে পারেনি। জামাই আভিজিৎ বরং খুব উৎসাহী ছিল। ভারী চমৎকার ছেলে,ইঞ্জিনিয়ার। কল্যাণীতেই সরকারি চাকরি করে, অন্তরাও একটা স্কুলে পাড়ায়,কাগজে বিঙ্ঘাপন দিয়ে বিয়ে ঠিক করেছিলেন বিদেশবাবু, ফরেস্ট রেঞ্জারের শিক্ষিতা একমাত্র কন্যাকে বিয়ে করার জন্য অনেকেই আগ্রহী ছিল। তার উপর অন্তরা ফর্সা, মাঝারি উচ্চতার, মোটের উপর সুন্দরী বলা যায়। সবার মধ্যে বেছে ঠিক পাত্রকেই পছন্দ করেছিলেন বলে মনেমনে গর্ব বোধ করেন বিদেশবাবু। জামাই চেয়েছিলেন বিদেশবাবু ওদের বাড়িতেই উঠুন। কিন্তু মেয়ের বাড়িতে থাকার কথা ভাবতে পারেননি বিদেশবাবু,ছি! ওতে মান সম্মান ডুবে যায়। তার থেকে একা থাকবেন স্থির করেছিলেন। একটা বাড়ি ভাড়াও দেখেছিলেন কল্যানীতে। কিন্তু মেয়ে নারাজ। একা একা যাবে না! আপদ বিপদ হলে রাতবিরেতে কি হবে? তাই সব দিক ভেবে এখানে আসা। মদনপুর থেকে ভিতরে গ্রামের মধ্যে জায়গাটা। খোলা মেলা পরিবেশ। জনা কুড়ি ওরই মত মানুষ থাকেন ওখানে। বৃদ্ধাশ্রমটা গ্রামেরই জমিদারের দেবোত্তর ত্রাস্তি বোর্দের তদারকিতে তৈরী হয়েছে। বছর পনেরো বয়স। অন্তরাই ওর স্কুলের এককলিগের কাছ থেকে খবর এনেছিল। তার দূর সম্পর্কের এক মাসিকে নাকি গত তিন বছর ধরে এখানেই রাখা হয়েছে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কিনা এই নিয়ে অন্তরার খুঁতখুঁতানি ছিল। সরেজমিনে দেখে ফিরে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল- না ভয়ের কিছু নেই। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জায়গাটা। বিদেশবাবুও আর অন্য কিছু ভাবেননি। তল্পিতল্পা গুটিয়ে ত্রিপুরা থেকে মদনপুরে চলে এসেছেন মাসখানেক আগে।                               নিজের একটা আলাদা ঘর নিয়েছেন বিদেশবাবু রুম শেয়ার করবেন কি করে?বছর পনেরো হল একাই আছেন। একা থাকাটা একটা অভ্যাস। অলকানন্দা চলে যাওয়ার পর নিঃসঙ্গতাই ওনার একমাত্র সঙ্গী। অভিষেক দেরাদুনে আর্মি স্কুলে পড়ত, অন্তরা শিলং –এ কনভেনটে মানুষ। ছেলে মেয়ে ছোট থেকেই বোর্ডিং জীবনে অভ্যস্ত ছিল বলে ওদের সাথেও খুব একটা সহজ হতে পারেন না। বরাবর দূরে থেকেছে বলে ওদের মনেও বাবার প্রতি খুব একটা অ্যাটাচমেনট ছিল না কোনকালেই। বাড়িতে ছুটিতে এলে মা’কে নিয়েই ব্যস্ত থাকত ওরা, অলকানন্দা খুব ভালোভাবে মিশতে পারত ওদের সাথে। বিদেশবাবুর সেসব ধাতে নেই। ছেলেমেয়ে মানুষ করতে গেলে একটা গাম্ভীর্যর আবরণ থাকা উচিত,নিজের বাবাকে দেখেই বরাবর জেনে এসেছিলেন। নিজের ছেলেমেয়েদেরও কাঠিন্যের বলয়ের বাইরেই রেখে এসেছেন বরাবর। স্নেহ থাকবে, তবে তা ফল্গুধারার মত সুপ্ত হয়ে বইবে। কথায় কথায় তার প্রকাশ হবে না। অভিষেক আর অন্তরা তাই ছোট থেকেই বাবার থেকে সম্ভ্রমের দুরত্ব বজায় রাখত। দিনান্তে ডিনার টেবিলে দু’ চারটে কথা- ব্যাস,অলকানন্দা দুপক্ষের মধ্যে সেতুর কাজ করত।               ও না থাকায় সেতুটাও ছিল না আর। ওরা ছুটি পেলেও বাড়ি ফিরতে চাইত না তেম্ন,অভিষেক এলেও, অন্তরা আসত না। বাবার থেকে সম্পূর্ন সরিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। অভিষেকের বাইক অ্যাক্সিডেন্টে মৃত্যু না হলে,অন্তরা বোধহয় বাবার প্রতি কর্তব্যের খাতিরে যেটুকু করছে,তাও করত না। অভিষেক চলে গেছে তাও বছর দশেক হল। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হয়ে জয়েন করেছিল আর্মিতে। চাকরির মেয়াদ মাত্র মাস তিনেক হয়েছিল। তারই মধ্যে একদিন ব্রেক ফেল হয়ে ওর বাইক খাদে পড়ে যায়। কেউ বলেছিল দুর্ঘটনা, কেউ বলেছিল র‍্যাশ ড্রাইভিং,কেউ বা অন্তর্ঘাতের গন্ধ পেয়েছিল। বাইকের ধবংসাবশেষ উদ্ধার হলেও ছেলের দেহ পাননি বিদেশ বাবু। তিস্তার জলে ভেসে গিয়েছিল বাইশ বছরের তরতাজা যুবক। অন্তরা তখন বছর আঠারো, ওকে শিলং থেকে নিয়ে এসে আগরতলার কলেজে ভর্তি করতে চেয়েছিলেন বিদেশবাবু। কাছে রাখতে চেয়েছিলেন,মেয়ে নারাজ,এক জেদ তার-কলকাতায় পড়বে,সন্তান হারানোর ভয়ে সন্তানকে আঁকড়াতে চাইলেও, সে চেয়েছিল দূরত্ব। মায়ের মৃত্যুটা অন্তরার মনে স্থায়ী দাগ কেটে গেছে। আজও হয় তো বাবাকেই মায়ের মৃত্যুর জন্যে দায়ী করে। নিজে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল বলে-বাবাকে ক্ষমা করতে পারে না। হয়তো কোনদিন করতেও পারবে না। অথচ অলকানন্দার মৃত্যুর জন্য কি বিদেশবাবু দায়ী? নিজেকে অসংখ্যবার প্রশ্নটা করেছেন। কোন উত্তর খুঁজে পাননি। মুহুর্তের জাড্য,সিদ্ধান্ত নিতে না পারার ব্যর্থতা, হাত-পাগুলো অবশ হয়ে যাওয়া-এসবই কি অলকানন্দাকে বাঁচাতে পারতেন না। বরং তার নিজের বিপদের সম্ভাবনা ছিল ষোলআনা। অন্তরা ভাবে বাবা ভয় পেয়েছিল। ভয় যে পেয়েছিলেন,এটা নিজেও অস্বীকার করেন না। তবে সেটা প্রানভয়, নাকি নাবালক সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা-শত বিশ্লেষণেও সদুত্তর পাননি বিদেশবাবু। বেশি ভাবনা চিন্তা করেন না তাই। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। বাকি জীবনটা অন্তরাকে চোখের দেখাটুকু দেখতে পারবেন- এই যথেষ্ট। সপ্তাহে একদিন আসার কথা অন্তরার। রবিবার,এরমধ্যেই দুই রবিবার আসতে পারেনি। বিদেশবাবু অধীর আগ্রহে বসে থাকলেও ফোন করে বিরক্ত করেননি মেয়েকে। সারা সপ্তাহ স্কুল থাকে ওর। সপ্তাহে একদিন তো পরিবারের জন্য সময় পায়। মেয়ের সাথে,স্বামীর সাথে, শ্বশুর, শাশুড়ির সাথে কাটাবে না ট্রেন ঠেঙিয়ে মদনপুর আসবে বাবাকে দেখতে? এলে তো একটা গোটা বেলা নষ্ট। তাও প্রত্যেক শনিবার  সন্ধ্যা থেকেই মনটা আকুল হয়ে ওঠে। অভিজিৎ ফোন করলে জিজ্ঞাসা করতে বাধোবাধো লাগে, তবুও জিজ্ঞাসা করেই ফেলেন, “কালকে কি মামনি আসবে? অভিজিৎ -এর ও উত্তরটা জানা থাকে না! বিচক্ষণ ছেলে,বিদেশবাবুকে সান্তনা দেয়, ‘হ্যাঁ,আসবে,আসবেই তো, কাল তো ছুটি’। জামাই-এর গলার স্বরের মধ্যে জোর খুঁজে পান না বিদেশবাবু। ওকে আর বিব্রত করেন না। ফোনটা ছেড়ে দেন।                  নিজে রান্না করে খেতে ভালো লাগে বিদেশবাবুর। বৃদ্ধাশ্রমের খাওয়ার মুখে তোলা যায় না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বটে জায়গাটা –কিন্তু কেয়ারটেকারের সংখ্যা খুব কম। রাতে যে দু’ জন থাকত, তার মধ্যে অসিত দিন দশেক হল কাজ ছেড়ে দিয়েছে। পড়ে আছে হারাধন। সে আবার নিজেই অকেজো, একটা পা জখম, টেনে টেনে হাঁটে। এতগুলো বৃদ্ধ মানুষ থাকেন এখানে। রাত বিরেতে আপদ বিপদ হতেই পারে। ডাক্তার বলতে গ্রামের হাতুড়ে পরেশ মন্ডল। তাও পরেশ ডাক্তারের চেম্বার আশ্রম থেকে মাইলখানেক দূরে। তার বাড়ি আরো ভিতরে। পাশের ঘরের প্রদ্যুৎবাবুর হাঁফেরটান বাড়াবাড়ি হলে হারাধন কি যে করবে বুঝতে পারছিল না। বিদেশবাবু ওকে সঙ্গে নিয়ে পরেশ ডাক্তারকে কল দিয়ে ডেকে এনেছিলেন। ইনজেকশন করে পরেশ ডাক্তার হাঁফ কমালে,হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন সবাই। না হলে তো হাসপাতালে নিয়ে যেতে হত। এত রাতে কল্যানীতে নিয়ে যাওয়া যাবে কি করে এই ভেবেই সবার মাথায় হাত পড়ে গিয়েছিল। গ্রামের সবে ধন নীলমণি একটা অ্যাম্বুলেন্স। মারুতি ভ্যান আর কি।তাও সেটা সেদিন ডেলিভারি কেস নিয়ে জওহরলালে ছিল। পরেশ ডাক্তার সামলাতে না পারলে ভ্যানে করে ষ্টেশন,ষ্টেশন থেকে কল্যানী–কে ছুটোছুটি করবে ভেবেই হারাধনের মুখ চুন হয়ে গিয়েছিল। ট্রাস্টের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারীর নাম্বারে বারবার ফোন করছিলেন বিদেশবাবু। দুজনেরই সুইচড অফ। মানুষ এতটা কেয়ারলেস কি করে হতে পারে,ভেবেই রেগে গিয়েছিলেন বিদেশবাবু। কুড়ি বাইশজন কে আশ্রয় দেওয়ার,দেখভাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কিভাবে হাত পা ছেড়ে বসে থাকতে পারেন এরা? ডোনেশন তো কম নেন না। বিদেশবাবুই তো সিঙ্গলরুম নেবেন বলে তিন লাখ টাকা ডোনেশন দিয়েছেন, অন্যরাও কম বেশি লাখ দেড়েক-দুয়েক দিয়েছেন। এতটাকা নিয়েও এত অযত্ন করার সাহস হয় কি করে? কয়েক দফা দাবি ট্রাস্টের ম্যানেজমেন্টের কাছে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বিদেশবাবু। প্রথমত-রাতে অন্তত তিনজন কেয়ারটেকার থাকতে হবে,দ্বিতীয়ত- সপ্তাহে একবার করে মেডিক্যাল চেকআপের ব্যবস্থা করতে হবে, তৃতীয়ত- আশ্রমের রান্না খাওয়ার মানের উন্নয়ন করতে হবে, চতুর্থত-কিছু জীবনদায়ী ওষুধ  আশ্রমেই মজুত রাখতে হবে। এই দাবীপত্র তৈরী করে সবাইকে দিয়ে সই করাতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছেন বিদেশবাবু। কেউ সই করতে চাননি। সবার একই মত-এসব দাবি দাওয়া পেশ করতে গিয়ে যদি যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তাও হাতছাড়া হয়ে যায়?কারোর তো কথাও যাওয়ার জায়গা নেই আর। সব কিছু ছেড়ে এখানে এসেছেন। এখান থেকে চলে যেতে হলে কোথায় যাবেন? কথাটার সত্যতা বিচার করে চুপ করে গিয়েছেন বিদেশবাবু। তার মত স্বেচ্ছায় কেউ এখানে আসেননি। তার মত কেউ শারীরিকভাবে সক্ষমও নন। সবাইকে সংসারের গলগ্রহ ভেবে এখানে পরিত্যক্ত আসবাবের মত ফেলে যাওয়া হয়েছে। কাউকে ছেলে ফেলে গেছে,কাউকে মেয়ে,কাউকে বা ভাইপো ভাইঝি। ফেলে গেছে মানেই ফেলেই গেছে। চোখের দেখাও দেখতে আসে না কেউ। খুব শরীর খারাপ করলে ট্রাস্ট বাড়িতে খবর পাঠায়। মুখ ব্যাজার করে ছেলে মেয়েরা দেখতে আসে তখন। কখন ফিরবে সেই চিন্তায় অধীর হয়ে বারংবার ঘড়ি দেখে ওরা। তাদের ডেকে এনে যেন ভয়ানক অন্যায় করাহয়েছে, এমনি তাদের হাবভাব।থাক,কারোর যদি মত না থাকে,এসব নিয়ে নাড়াঘাটা না করাই ভাল। তবে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত মানুষের কাছে থেকে সই পেয়েছেন বিদেশবাবু। মিসেস চৌধুরী। বিদেশবাবুর থেকে বছর দুয়েকের ছোট হবেন মহিলা। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। অভিজাত বংশীয়া-দেখেই বোঝা যায়। উনিও স্বপাকে খান। সিঙ্গল রুমে থাকেন। কারোর সাথে মেশেন না। আশ্রমের বাকিরা আড়ালে আবডালে বলে ‘বড্ড দেমাক’। উনার সামনে কেউ বলতে সাহস পায় না। উনার গাম্ভীর্জ সে সাহস দেয় না। বিদেশবাবুও এড়িয়ে চলেন উনাকে। আশ্রমে এসে প্রথম প্রথম উনার ব্যাপারে না জেনে কুশল জিজাসা করে ফেলেছিলেন বার দুয়েক। এড়িয়ে যাওয়া দেখে আহত হয়েছিলেন। তারপর থেকে এড়িয়ে চলেন।ভদ্রমহিলা নিঃসন্তান। স্বামী বছর দশেক হল মারা গেছেন। নিজের সব সম্পত্তি নাকি স্কুলকে দান করে দিয়েছেন। সারাদিন নিজের ঘরে বন্দী থাকেন। বিকাশদা বলেছিলেন ম্যাডামের ঘর নাকি বইদিয়ে ঠাসা। সারাক্ষন বই এর মধ্যেই ডুবে থাকেন,সে থাকুন, যার যেভাবে থাকতে ভালোলাগে, তার সেভাবে থাকা ভাল। তবে একই ছাদের নীচে থাকতে গেলে পারস্পরিক আলাপচারিতারও প্রয়োজন আছে। নয়া হলে এক ঘরে হয়ে যেতে হয়। মিসেস চৌধুরীও তাই এক ঘরে।                         একটা ইনডাকশন কিনেছেন বিদেশবাবু। ইনডাকশনে রান্না করার কৌশল শিখে নিয়েছেন। খুব সহজ ব্যাপারটা। আর আগুনের সামনে যেতে হয় না। আগুন জিনিসটা যতটা পারেন এড়িয়ে যান বিদেশবাবু।ছোট থেকেই উনার আগুনে ভয়, ছোটবেলায় উনাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল পূর্বপাকিস্থানেরসংখ্যাগুরুরা, কোনক্রমে প্রান নিয়ে সীমান্ত টপকে এদেশে এসেছিলেন বাবা, মা- সাথে পাঁচ ভাইবোন। আগুনের লেলিহান শিখায় সব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। দোতলা বাড়ি, বাগান –সব। তখন বিদেশবাবুর বয়স মাত্র দশ। ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন উনি। ‘আগুন-আগুন-পালাও-পালাও’-চিৎকারটা কানে ভাসে আজো,প্রানের ভয় ঐ বয়সে প্রথম পেয়েছিলেন। ঐ ভয়টা মজ্জায় ঢুকে গেছে,তাই আগুন দেখলে স্থানু হয়ে যান। কাছে যাওয়ার বদলে সরে যান, পালিয়ে যান। রান্নাঘরের গ্যাস থেকে অলকানন্দার সারা শরীরে যখন আগুন লাগল- ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ চিৎকারে যখন রান্নাঘর পেরিয়ে,ডাইনিং পেরিয়ে সদর দরজা খুলে, বাইরের খোলা জায়গাটায়  ছুটে গেল অলকানন্দা,তখন বিদেশবাবু স্থির হয়ে গিয়েছিলেন। এক পা-ও এগোতে পারেননি।ছুটে গিয়ে যে জল ঢালবেন, কি কম্বল চাপা দেবেন-মাথায় আসেনি কিছুই। বছর তেরোর অন্তরা পাগলের মত মায়ের দিকে ছুটে যেতে ছেয়েছিল। ওকে টেনে ধরে রেখেছিলেন। যেতে দেননি। অলকানন্দা তো পুড়ছেই, যদি মেয়েটাও পুড়ে যায়?আশেপাশের বাড়ি থেকে প্রতিবেশিরা ছুটে এসে উদ্ধার করে অলকানন্দাকে। হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই সব শেষ। অলকানন্দা যখন পুড়ছিল তখন ওর দুই চোখে কষ্ট,যন্ত্রনার পাশাপাশি অবিশ্বাসও দেখতে পেয়েছিলেন বিদেশবাবু। ঐ চোখদুটো এখনো ঘুমের মধ্যে তাড়া করে। আর তাড়া করে অন্তরার একটা কথা।বাবাকে কোন অভিযোগ সে করতে পারেনি কখনো। মায়ের কাজ করতে অভিষেক বোর্ডিং থেকে ফিরলে একান্তে দাদাকে বলেছিল, ‘বাবার জন্য মা মরে গেল দাদাভাই,বাবা চাইলেই বাঁচাতে পারত। আমি বাবাকে কখনো ক্ষমা করব না’ দরজার আড়াল থেকে কথাগুলো শুনেছিলেন বিদেশবাবু। মেয়ের সামনে যেতে পারেনি। মেয়েকে কখনো প্রশ্ন করতে উঠতে পারেন নি,এতদিন পরেও সে বাবাকে ক্ষমা  করেছে কিনা। উত্তরটা নঞর্থক হবে,সেটা নিজের মনেই জানেন। মেয়েকে কখনো বলতে পারেননি,অলকানন্দাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন উনি, খুব করেই বাঁচতে চেয়েছিলেন। অথচ তার সমস্ত চেতনার ভেতর থেকে ভেসে আসছিল চিৎকার,‘আগুন, আগুন-পালাও-পালাও!’করে কণ্ঠের চৎকার এখন আর বুঝতে               পারেন না। বাবা,বড়দা,মা,বড়দি...নাকি সবার মিলিত কণ্ঠস্বর ওনার কানে বাজতে থাকে, বাজতেই থাকে।   -কাকু... হারাধনের গলা পেয়ে চমকে ওঠেন   বিদেশবাবু। হাঁফাচ্ছেন কেন? কার কি হল?   -কি হল হারাধন? -চৌধুরী ম্যাডাম সিঁড়ি থেকে পরে গেছেন।জামা কাপড় তুলতে গিয়েছিল,পা ফস্কে পড়ে... -সে কি রে! চল শিগগির চল... প্রায় দৌড়ে সিঁড়ির কাছে পৌঁছলেন বিদেশবাবু। আরো জনা দশেক তার আগেই  চলে এসেছেন। কেউ কাছে এগোবার সাহস করছে না। বারান্দার বাল্বের আলোয় দেখা যাচ্ছে কপালটা ফেটে গেছে। রক্ত ঝরছে।  মিসেস চৌধুরী নিজের হাতেই কপাল চেপে ধরে বসে আছেন। এত যন্ত্রনাতেও কোন কষ্ট প্রকাশ করছেন না। সরুন দেখি সবাই, হারাধন, পরিস্কার কাপড় আন একটা। বিদেশবাবু ভিড় সরিয়ে মিসেস চৌধুরীর কাছে গেলেন। বলিহারি মহিলা বটে। কষ্ট পেলে তা মুখেবলতে ক্ষতি কি? কারোর সাহায্য চাইলে কি ছোট হয়ে যেতে হয়? হারাধন দৌড়ে কাপড় নিয়ে আসে। -দেখি, হাতটা সরান, কাপড়টা বাঁধতে হবে। -আঃ! ডেটল লাগিয়ে নেব। সামান্য তো কাটা... -সামান্য? কপাল ফেটেছে আপনার, হাঁ হয়ে আছে। বিদেশবাবু জোর করে হাত সরিয়ে কাপড়টা বেঁধে দিলেন। হারাধনকে ডাকলেন -ভ্যান ডাক। পরেশ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। -কোথাও যাবো না। আমি ঠিক আছি। উঠে পড়তে গেলেন মিসেস চৌধুরী। পারলেন না। মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন,বিদেশবাবু ধরে নিলেন। জওহরলালে আরো একদিন থাকতে হত। ডাক্তাররা কিছুতেই ছাড়বেন না, মিসেসচৌধুরীও থাকবেন না। শেষে বন্ডে সই করেবিদেশবাবু ফেরৎ নিয়ে আসছেন ওনাকে।জেদও বটে। সেদিন  রাতে পরেশ ডাক্তার কপালে সেলাই কোনক্রমে করেই হাত তুলে নিল। কপালে চোট, জ্ঞান নেই- এমন রোগী হাতে রাখবেন না। ভাগ্যে অ্যাম্বুলেন্সটা ছিল। হারাধন আর বিদেশবাবু নিয়ে এসে জওহরলালে ভর্তি করেন। ইনজেকশন,স্যালাইন চলতেই  এসেছিল। জ্ঞানফিরতেই আশ্রমে ফেরার জেদ শুরু। কোনক্রমে দিন দুয়েক কেবিনে রেখেদিয়েছিলেন বিদেশবাবু, সিটি স্ক্যান করানো হয়েছে। না। ব্রেনে হ্যামারেজ হয়নি, নিশ্চিন্তহয়েছিলেন বিদেশবাবু। টানা দুদিন তিনরাত হাসপাতালে থেকে নিজেরও শরীর চলছিলনা। হারাধন তো ভর্তি করিয়েই পগার পার।আশ্রম থেকেও কেও আর চোখের দেখাও দেখতে আসেনি, মিসেস চৌধুরীর তিন কুলে কেউ নেই,যে আসবে। ফলত বিদেশবাবুর ঘাড়েই সব দায়িত্ব এসে পড়েছিল। সমস্ত খরচ খরচাও ওনাকে করতে হয়েছে। মিসেস চৌধুরী অবশ্য ঐ অবস্থাতেও বারবার বলে গেছেন, ‘আমার চেক বইটা এনে দিতে বলুন’। ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। বিদেশবাবুও শুনিয়ে দিয়েছেন, ‘আগে সুস্থ হয়ে উঠুন ,পরে ঐ সব হিসাব নিকাশ হবে,’কিন্তু আপনি এসব আমার জন্য করবেন কেন? আর করলেও আমি দয়া নেব কেন?’ ‘দয়া নয়। মানবিকতার খাতিরে করছি, শোধ দিয়ে দেবেন’। বিদেশবাবুর কথায় এমন কিছুছিল, আর কথা বাড়াত পারেন নি মিসেস চৌধুরী। -কাকু ,কাকিমা এখন একদম সুস্থ বল? অ্যাম্বুলেন্স চালাতে চালাতে সুশান্ত বলল।ও অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার। ও–ই মিসেস চৌধুরীকে কল্যানীতে এনেছিল,বিদেশবাবু আড়চোখে তাকালেন মিসেস চৌধুরীর দিকে। -সুস্থ মানে, ঐ আর কি। আরো কয়েকটা দিন থাকা উচিৎ ছিল। তা উনি থাকবেন না। -না, না, ভালো করেছে চলে এসেছে। কাকিমা তোমার কাছে থাকলেই ফিট হয়ে যাবে একদম। জানো কাকিমা, কাকু তোমার জন্য একভাবে হাসপাতালে বসেছিল। যখন যা লেগেছে, নিয়ে এসেছে। কাকু ন থাকলে তুমি সুস্থ হতে না। খুবভালোবাসে তোমায়,বুঝলে?   বিদেশবাবু চমকে উঠলেন। কি বলছেটা কি ছেলেটা? ভুল বুঝেছেও, যেমন কেবিনের বাচ্চা মেয়ে নার্সটাও বুঝেছিল। ‘তাড়াতাড়ি এই দুটো ইনজেকশন নিয়ে আসুন,আপনার ওয়াইফের লাগবে’। ওর ভুল ভাঙাননি বিদেশবাবু, সুশান্তর ভুলটা ভাঙানো উচিত। উনি ভাঙাবেন, নাকি মিসেস চৌধুরী.. -আমি তোমার কাকুর কাছে কৃতজ্ঞ তাই। শান্ত ধীর গলায় মিসেস চৌধুরী। ওনার ভালো নাম অনুরাধা। হাসপাতালে ভর্তি করতে গিয়েই জেনেছেন বিদেশবাবু।ভারী অবাক হলেন। সুশান্তর ভুলটা ভাঙলেন না তো। বিদেশবাবুর চোখে অবাক ভাবটা দেখেও দেখলেন না মিসেস চৌধুরী। চোখ সরিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন, অপলকে। রাস্তার দুপাশের দৃশ্য দেখছিলেন, একটা অদ্ভুত মুগ্ধতা ভরা ছিল চোখ দুটোতে।এভাবে আরো একজন রাস্তা দেখত, তার চোখেও একই মুগ্ধতা ভিড় করে থাকত।বিদেশবাবু চোখ সরালেন না। অপলকে দেখতে থাকলেন তাকে। -অনুরাধা,আপনি এই অসুস্থ শরীরে রান্না করবেন? -এখন তো আমি বেশ সুস্থ, রান্না করা যেতেই পারে। -না,বলছিলাম কি,আরো কয়েকদিন আমার ঘরেই খান না। আনুরাধা মৃদু হাসেন। বিদেশবাবু সে হাসির অর্থ বোঝেন না। -খাবেন? -মায়া বাড়াব? -মায়া কিসের? আপনি অসুস্থ বলেই না... -সুস্থ হলে? আমি রান্না করব,আর আপনি খাবেন? -বাঃ রে! তা কেন? তখন নিজেই নিজের রান্না করে নেব। ঋণী করে রাখতে চান? বিদেশবাবু থমকান। -আপনাকে কথায় হারনো যাবে না। ঋণ তো সব শোধ করেই দিয়েছেন। চেক লিখে দিলেন যে। -প্রান বাঁচানোর ঋণ কি এ জীবনে শোধ হবে বিদেশবাবু? নরমস্বরে বলেন মিসেস চৌধুরী। এই ক’দিনে অনুরাধাকে কাছথেকে চিনেছেন বিদেশবাবু। কাঠিন্যটা তারমুখোশ। আদতে মানুষটি খুব নরম মনের। -অত ঋন ঋন করবেন না, আমার যা ঠিক মনে হয়েছে, তা-ই করেছি। -তাও, সত্যিটা তো বলতেই হয়। -তাহলে আপনি রাঁধবেন? -আজ রাঁধি? আপনার মেয়ে আসবে আজ। রবিবার তো, ওর সাথে কথা বলবেন, সেখানে আমার যাওয়াটা বেমানানহবে। বিদেশবাবু দমে যান। সত্যিই তো আজ অন্তরা আসবে বলেছে। অনুরাধার সেবাকরা, ওকে রেঁধে খাওয়ানো-ভালোভাবে না-ই মানতে পারে। অথচ বিদেশবাবু যা করেছেন, সবই মানবিকতার খাতিরে। এর মধ্যে কোন চাওয়া পাওয়ার খাদ নেই। -আচ্ছা সাবধানে রান্না করবেন। অনুরাধা মিষ্টি করে হাসলেন,অলকানন্দার হাসির কথা মনে পড়ল বিদেশবাবুর। সে-ও কিছু কিছু কথার জবাব দিত না, শুধু হাসত। অন্তরা এসেছিল। অভিজিৎও এসেছিল সাথে। কুট্টুসকেও নিয়ে এসেছিল। নাতনিকে অনেকদিন পরে দেখে মনটা ভরে গিয়েছিল বিদেশবাবুর। কুট্টুসের সাথে খেলছিলেন, হঠাৎ চেঁচামেচি শুনে চমকে উঠলেন। -কি হল আবার? অন্তরা বিরক্ত হল, হারাধন ছুটতে ছুটতে এল। -কাকু...তাড়াতাড়ি চল... -কেন রে? কি হয়েছে? -চৌধুরি ম্যাডাম... আর শোনার প্রয়োজন বোধকরলেন না বিদেশবাবু। একপ্রকার ছুটেই অনুরাধার ঘরের সামনে গেলেন। অন্তরা,আভিজিৎও পিছু নিল। -বিদেশবাবু যাবেন না...আগুন লেগেছে..। প্রদ্যুৎবাবু নিরস্ত করতে চাইলেন। চমকে তাকালেন বিদেশবাবু, সত্যিই আগুন লেগেছে, অনুরাধার ঘরে আগুন লেগেছে। অনুরাধা চেঁচাচ্ছে। ওর গায়েও কি আগুনলেগেছে? -স্টোভ বার্স্ত করেছে মনে হয় -আওয়াজ তো শুনলাম না। জটলা থেকে গুঞ্জন শোনা যায়।বিদেশবাবুর কানে ভাসে চিৎকার,‘আগুন,আগুন...পালাও...পালাও...’পালাতে চান উনি। চলে যেতে যান। যেতে পারেন না। স্থানু হয়ে যান যেন। ‘বাঁচাও,বাঁচাও--- চিৎকার শোনা যায়। কে ডাকছে?অলকানন্দা অলকানন্দাই তো, বাঁচাতে হবে ওকে –বাঁচাতেই হবে, অথচ কি করে আগুনের কাছে যাবেন বিদেশবাবু?অন্তরার দিকে তাকান বিদেশবাবু ,ফ্যাকাশে হয়ে গেছে মেয়েটা। ভয় পাচ্ছে। ওর ভয় কেবলমাত্র ওর বাবাই কাটাতে পারেন,অথচ হাত পা চলছে না যে? ‘জল আন, জল’- ‘কম্বল আন’---। কথাগুলো কানের মধ্যে ঢুকেও ঢোকে না, অন্তরা আড়চোখে ওনার দিকে তাকায়। কি ভাবছে মেয়েটা? ভাবছে, বাবা এখনো অমন কাপুরুষই রয়ে গেছে? ওর চোখে কি লেগে আছে? ধিক্কার? নাকি ঘেন্না? ‘প্রান বাঁচানোর ঋণ এ জীবনে শোধ হবেবিদেশবাবু? প্রশ্নটি স্পষ্ট শুনতে পান যেন।কেউ যেন ধাক্কা দেয় ওকে, ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মত ছিটকে যান। দৌড়ে যান অনুরাধার ঘরের দিকে। ‘বিদেশবাবু, যাবেননা...‘কাকু, যেও না’...সব কথাগুলোর                      ভিড়ে অন্তরার গলা থেকে বেরোনোবাক্যবন্ধটা ডুবে যায়। ‘বাবা,যেওনা...যেওনা’...বলতে চায় ও ওর গলা ধরে  আসে। অনুরাধাকে পাঁজাকোলা করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন বিদেশবাবু, জল দিয়ে আগুন ততক্ষনে অনেকটাই নেভানো গেছে,কম্বলে মুড়ে নিয়েছিলেন অনুরাধাকে। আগুন ততদূর যাওয়ার আগেই বিদেশবাবু গিয়ে উদ্ধার করেছেন ওনাকে। জ্ঞানহারিয়েছেন অনুরাধা। সবাই চোখে মুখে জল দিচ্ছে,অন্তরা অবাক হয়ে দেখে বাবার দুহাতের পাঞ্জা ভালোভাবেই পুড়ে গেছে। যন্ত্রণা হচ্ছে নিশ্চয়। কষ্ট হচ্ছে, এত কষ্ট বাবা টেরও পাচ্ছেন না? অবাক হয় অন্তরা,বাবা বিড়বিড় করে কি বলে চলেছেন। কান পাতে ও, ‘অলকানন্দা...ওঠো, চেয়ে দেখ...আমি এসে গেছি--- ‘অভিজিত’ বিস্মিত হলেও অন্তরা হয় না। ‘বাবা, বাবা...জ্ঞান ফিরে আসবে...ওনার কিছু হয়নি...তুমি ওঠো--- তোমার হাত পুড়ে গেছে-চিকিৎসা দরকার!’ মেয়ের গলা শুনে মুখ তুলে তাকান বিদেশবাবু। অন্তরা দেখে বাবার মুখে শিশুর হাসি লেগে আছে। ‘মামণি.. -হ্যাঁ, বাবা...ওঠো... -তোর মা’কে আমি বাঁচাতেপেরেছি...বাঁচাতে পেরেছি... অন্তরা বোঝে না একথার জবাব কি দেবে?একথার কি জবাব হয়? শুধু বোঝে, বাবা মা’ কে বাঁচাতে চেয়েছিল,কখনো পেরেছে,কখনো পারেনি।